
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল রায় বিএনপিকে এক নতুন উচ্চতায় আসীন করেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিপুল বিজয় কেবল গৌরবের নয়, বরং এটি তারেক রহমানের জন্য ‘স্টেটসম্যান’ বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ।
জনগণের উপহার ও দলের দায়
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি যতটা না নিজেদের শক্তিতে জিতেছে, তার চেয়ে বেশি প্রগতিপন্থী জনগণ তাদের জিতিয়েছে। দেশের জন্মলগ্নের রক্তাক্ত ইতিহাস এবং জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী মববাজি ও অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিয়েছে। এই ভোট যেন প্রগতিশীল বাংলাদেশের পক্ষে জনগণের উপহার।
তবে দলের এই বিশাল অর্জনের পর তারেক রহমানের কাঁধে চেপেছে প্রভূত চাপ। ২০০৬ থেকে ২০২৬—গত ২০ বছরের রাজনৈতিক শূন্যতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের ওপর চলা উৎপীড়নের পর দলটিকে সুসংগঠিত করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের পরে দলে ‘দুধের মাছি’ বা সুবিধাবাদীদের আনাগোনা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মোকাবিলা করে দল পরিচালনায় দক্ষতা দেখাতে হবে।
ত্রাতা নাকি শুধুই সরকারপ্রধান?
বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের কাছে জনগণের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। তাকে এখন আর কেবল দলীয় প্রধান নয়, বরং জনগণের ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার বিভাগীয় স্বচ্ছতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার মতো হাজারো কাজের তালিকা তার সামনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ক্ষমতার স্বাভাবিক নিয়মেই জনগণের সাথে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। কিন্তু তারেক রহমানকে সেই প্রকোষ্ঠে বন্দি না হয়ে তৃণমূলের সাথে সংযোগ বজায় রাখতে হবে। একই সাথে দলের বর্ষীয়ান নেতাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ব্যস্ত রেখে দলের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করার জন্য নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে হবে।
পরমতসহিষ্ণুতার পরীক্ষা
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর সংযমী বক্তব্য রাখলেও, প্রতিপক্ষ শক্তি তাকে সেই অবস্থান থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করবে। বিএনপি কি বিরোধী মতকে স্বাগত জানিয়ে সত্যিকারের উদারনৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা করতে পারবে? তারেক রহমানের পরিকল্পিত পরিবর্তনগুলো বিএনপির তৃণমূল ধারণ করতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। ৫ বছর পর জনগণ ঠিকই তাদের কাজের হিসাব নেবে, তাই রাষ্ট্র ও দল—উভয় ক্ষেত্রেই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।







