ভোটের মাঠ গরম: আদর্শিক লড়াই নাকি পুরোনো শত্রুতা? মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ তৈরি হলেও, প্রচারণার শুরুতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। গত ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় ঐক্য। তবে প্রচারণার মাত্র দুই দিনের মাথায় দৃশ্যপট বদলে গেছে; মিত্রতা নয়, বরং পাল্টাপাল্টি আক্রমণ আর আদর্শিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে দল দুটি।
মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম নিয়ে তারেক রহমানের তোপ
গত দুই দিনে দেশের আটটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াতের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও তাদের রাজনৈতিক দর্শনের মূলে আঘাত করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভোটারদের সতর্ক করেন। বিশেষ করে ধর্মের নামে ‘বেহেশতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে তিনি ‘শিরক’ ও ‘কুফরি’ বলে কড়া সমালোচনা করেন। তারেক রহমানের ভাষ্যমতে, প্রতিপক্ষ দলগুলো ধর্মের অপব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এছাড়া তিনি এনআইডি সংগ্রহ ও পোস্টাল ব্যালট ছিনতাইয়ের মাধ্যমে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তৃণমূল কর্মীদের সজাগ থাকার নির্দেশ দেন।
জামায়াতের পাল্টা চ্যালেঞ্জ: ‘মুফতি’ কটাক্ষ ও খয়রাতি রাজনীতি
বিএনপির আক্রমণের মুখে বসে থাকেনি জামায়াতও। খুলনার এক সমাবেশে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বিলেত থেকে এসে উনি এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন মুসলমান কীভাবে অন্য মুসলমানকে ‘কাফের’ বলার দুঃসাহস দেখায়?
অন্যদিকে, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির সামাজিক উন্নয়ন ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পরিকল্পনাকে ‘খয়রাতি অনুদান’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, মানুষকে কার্ড দিয়ে অপমান করার চেয়ে তাদের আত্মসম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বড় কথা। জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপিকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ এবং ‘দিল্লির আধিপত্যবাদের সহযোগী’ হিসেবেও চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: সংঘাতের শঙ্কা কতটুকু?
মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, দুর্নীতি এবং বিদেশি আধিপত্য—এই কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দলের বাগ্যুদ্ধ এখন তুঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে, এটি দল দুটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই। তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সমালোচনা থাকবেই, তবে তা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে কোনো বড় ধরনের সংঘাতের রূপ না নেয়।”
লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এক সময় যা আওয়ামী লীগ বলত, এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার খাতিরে সেই একই ইস্যুগুলো বিএনপি সামনে আনছে। এটি মূলত ভোটের সমীকরণে এগিয়ে থাকার একটি কৌশল।
ভোটের নতুন সমীকরণ
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের লড়াই এখন দুই মেরুতে বিভক্ত। বিএনপি যেখানে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে, সেখানে জামায়াত ‘ইনসাফ কায়েম’ ও ‘আধিপত্যবাদ বিরোধিতার’ কার্ড খেলে সেই নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। দুই শিবিরের এই মুখোমুখি অবস্থান শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।







