কারাফটকে নিথর স্ত্রী-সন্তান: কেন শেষ দেখা হলো না সাদ্দামের? নেপথ্যে আইনি মারপ্যাঁক না অসতর্কতা!
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট ও যশোর

শীতের বিকেলটা নিমিষেই বিষাদে রূপ নিল যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের সামনে। একটি সাদা অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে আছে ২২ বছরের তরুণী কানিজ সুবর্ণা আর তার ৯ মাসের দুধের শিশু সেজাদ হাসান। কারান্তরালে থাকা স্বামী জুয়েল হাসান সাদ্দামকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছে তারা—তবে জীবিত নয়, নিথর দেহ নিয়ে। কারাগারের লোহার শিকের ওপার থেকে ৫ মিনিটেরও কম সময়ের জন্য নিজের সাজানো সংসারকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখলেন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের এই নেতা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেন তিনি প্যারোলে মুক্তি পেয়ে জানাজায় অংশ নিতে পারলেন না?
ঘটনার সূত্রপাত: একটি সাজানো সংসারের মর্মান্তিক সমাপ্তি
গত শুক্রবার বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে নিজ ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় কানিজ সুবর্ণার ঝুলন্ত মরদেহ এবং বাথরুমের বালতির জল থেকে উদ্ধার হয় ৯ মাসের শিশু নাজিফের নিথর দেহ। স্থানীয়দের মতে, স্বামী কারাবন্দী হওয়ার পর থেকে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন কানিজ। স্বামীর প্রতি ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক থেকেই কি তিনি এই চরম পথ বেছে নিলেন? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য? কানিজের বাবা রুহুল আমিন ইতিমধ্যে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—মা আত্মহত্যা করলেও শিশুটি কীভাবে মারা গেল?
আক্ষেপের ৫ মিনিট: ‘ভালো বাবা হতে পারলাম না’
লাশবাহী গাড়ি যখন যশোর কারাগারের সামনে পৌঁছায়, তখন চারদিকে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সাদ্দামকে যখন বাইরে আনা হয়, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তানের মাথায় হাত রেখে আক্ষেপ করে বলছিলেন, “জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারলাম না, এখন নিয়ে কী করব? আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না, ভালো স্বামীও হতে পারলাম না।” কানিজকে শেষ বিদায় জানিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাকে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
কেন মিলল না প্যারোলে মুক্তি?
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। তবে সরকারি ভাষ্য ও আইনি জটিলতা বলছে ভিন্ন কথা। সাদ্দামের পরিবার বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলেও তিনি বর্তমানে বন্দী ছিলেন যশোর কারাগারে।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, যেহেতু বন্দী যশোর কারাগারে ছিলেন, তাই প্যারোল দেওয়ার এখতিয়ার ছিল যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। অন্যদিকে, যশোর জেলা প্রশাসনের দাবি, তাদের কাছে কোনো লিখিত আবেদনই করা হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি এই প্যাঁচ বুঝতে না পারাই হয়তো সাদ্দামের মুক্তি না হওয়ার প্রধান কারণ।
জেল কর্তৃপক্ষের দাবি, মানবিক দিক বিবেচনা করে তারা মৌখিক অনুরোধেই কারাফটকে লাশ দেখার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা না কি পরিবারের অজ্ঞতা—কোনটি সাদ্দামকে তার স্ত্রী-সন্তানের শেষ বিদায়ে শামিল হতে দিল না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।







