বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

নতুন ভোরে নতুন চ্যালেঞ্জ: তারেক রহমানের বিএনপির সামনে গণতন্ত্র ও অর্থনীতির কঠিন পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

১৫ বছরের ক্ষমতার দাপট ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরেছে বিএনপি। দীর্ঘ বিরতির পর দলের হাল ধরে তারেক রহমান যে নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে এনেছেন, তা রাজনৈতিক মহলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ভোটারদের এই বিপুল আস্থার প্রতিদান কি নতুন নেতৃত্ব দিতে পারবে?

গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ক্ষমতার হাতবদলের মধ্য দিয়ে। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। গত বছরের শেষে লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসন শেষ করে দেশে ফেরার পর তারেক রহমান প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে তার ওপর দলের চাপানো ভরসা আকাশচুম্বী, আবার পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগের কারণে সমালোচকদের তীরও তার দিকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভীন মুর্শিদ মনে করেন, তারেক রহমানের পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব তার জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। তিনি বলেন, “মানুষ পরিবর্তনের সুযোগ দিতে চায়। তারা ভাবতে চায় নতুন ও ভালো কিছু করা প্রকৃতপক্ষে সম্ভব। তাই অনেক আশা রয়েছে।”

তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা: ‘আর লড়াই নয়, সুশাসন চাই’

বিএনপির এবারের মূল প্রতিশ্রুতি গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসলেই পুরোনো দলগুলো যেভাবে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, সেই ইতিহাস ভুলে যায়নি দেশের জনগণ।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্ম এবার আর কোনো ফাঁকা বুলিতে রাজি নয়। অভ্যুত্থানের অন্যতম কর্মী তাজিন আহমেদ (১৯) দৃঢ়তার সাথে বলেন, “সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় ছিল না। আমাদের দেশ যখন কোনো দুর্নীতি ছাড়া চলবে ও অর্থনীতি ভালো হবে, সেটাই হবে আমাদের মূল বিজয়।”

তার সহযোদ্ধা তাহমিনা তাসনিম (২১) যোগ করেন, “আমরা প্রথমেই মানুষের মধ্যে ঐক্য চাই। আমরা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি এবং জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। তাই, যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, আমরা আবার রাস্তায় নামার অধিকার রাখি।”

নতুন সরকারের সামনে কঠিন অগ্নিপরীক্ষা

তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তার দলের পুরোনো ভাবমূর্তির গ্লানি মুছে ফেলে একটি স্বচ্ছ প্রশাসন উপহার দেওয়া। বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং সংঘাতের ছায়া রেখে যাচ্ছে, তা নতুন সরকারকে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা।

  • অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে আনা।

  • কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর হতাশা দূর করা।

সংসদে নতুন সমীকরণ ও জামায়াতের উত্থান

নির্বাচনের ফলে আরেকটি বড় চমক হলো ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখযোগ্য আসন জয়। সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা সতর্ক করেছেন যে, সংসদে এবার এমন অনেক সদস্য বসতে যাচ্ছেন যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই।

জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে সংশয় থাকলেও, বিশ্লেষকরা মনে করেন তাদের তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন শক্তিশালী। তবে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নে লুৎফা সব রাজনৈতিক দলকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা যেসব নারী জুলাই অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম, সব রাজনৈতিক দল আমাদের সেই সম্মিলিত ভূমিকাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা নির্বাচনী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।”

ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যা দিয়ে নতুন নির্বাচনের দাবি জানালেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া অপরিপক্কতা হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে, নতুন সরকার তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন:

Back to top button