
সুদানের এল-ফাশার শহরে ‘গণহত্যার’ সময় পরিবারের সামনেই শিশু ও যুবকদের হত্যা করছে দেশটির আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)। হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজনের বর্ণনায় এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
বেঁচে যাওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছে, উত্তর দারফুরের এই শহরটি দখলের পর থেকে সেখানে চলছে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও লুটপাট। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতিকে ‘প্রলয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
শনিবার (১ নভেম্বর) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেঁচে যাওয়া বহু মানুষ জানিয়েছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা শহর দখলের পর পরিবারগুলোকে আলাদা করে কিশোর ও তরুণদের ধরে নিয়ে গেছে ও অনেককে তাদের স্বজনদের সামনেই মেরেও ফেলেছে।
জাহরা নামে ছয় সন্তানের এক মা জানিয়েছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা তার সামনে থেকেই তার দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে যান। আরএসএফের সদস্যরা দাবি করেছিল, জাহারার ছেলেরা সেনাবাহিনীতে যুদ্ধ করেছে।
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী আদম জানান, তার চোখের সামনেই ১৭ ও ২১ বছর বয়সী দুই ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা আমাকে লাঠি দিয়ে মারলেন ও তারপর বললেন, আপনার ছেলেরা সেনাবাহিনীর হয়ে লড়েছে, তাই তাদের মরতে হবে।
শিশু ও তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, অনেকেরই খোঁজ নেই
বেঁচে যাওয়া একাধিক পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আরএসএফ যোদ্ধারা পুরুষ, নারী ও শিশুদের আলাদা করে ফেলছেন। তরুণ ছেলেদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অজানা গন্তব্যে। অনেকেরই এরপর আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
আরেক নারী হায়াত বলেন, আমরা যখন পালাচ্ছিলাম, তারা তরুণ ছেলেদের আলাদা করে থামিয়ে রাখলেন। এরপর কী হয়েছে, আমরা জানি না।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, এল-ফাশার থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫ হাজার মানুষ শহর ছেড়ে পালাতে পেরেছে। কিন্তু শহরে এখনো লাখো মানুষ আটকা পড়ে আছে, যাদের মধ্যে শিশু ও নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, আরএসএফ ও তাদের মিত্ররা অনেক মানুষকে নিরাপদ এলাকায় যেতে দিচ্ছে না। শুধু ৫ হাজার মানুষ তাউইলা শহরে পৌঁছাতে পেরেছে, অথচ এল-ফাশার ছিল প্রায় আড়াই লাখ মানুষ।
এমএসএফের জরুরি বিভাগের প্রধান মিশেল অলিভিয়ার লাশারিতে বলেন, যত মানুষ পালিয়েছে, সেই সংখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তার মানে শহরে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ হয় নিহত, নয় বন্দি, নয়তো লুকিয়ে আছে।
স্যাটেলাইটে ধরা পড়ছে গণহত্যার প্রমাণ
ইয়েল ইউনিভার্সিটির হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাব জানিয়েছে, শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্রে এল-ফাশারের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩১টি স্থানে মানবদেহের মতো বস্তুর ক্লাস্টার দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, আবাসিক এলাকা ও সামরিক ঘাঁটিতে মরদেহর মতো বস্তু পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
গণহত্যা অব্যাহত থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল শনিবার (১ নভেম্বর) বাহরাইনে এক সম্মেলনে বলেছেন, সুদানের পরিস্থিতি একেবারেই বিপর্যস্ত। সেখানে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট চলছে।
এদিকে, আরএসএফ দাবি করেছে, শহর দখলের সময় কিছু যোদ্ধাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের মানবিক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, তাদের এই কথায় বিশ্বাস করা কঠিন। তারা যে পরিকল্পিতভাবে মানুষ হত্যা করছে, তার প্রমাণ এখন স্পষ্ট।
আরএসএফ এখন দারফুরের পাঁচটি প্রাদেশিক রাজধানীর সবগুলোই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ফলে দেশটি কার্যত পূর্ব-পশ্চিম অক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। উত্তর, পূর্ব ও কেন্দ্রীয় অঞ্চল সেনাবাহিনীর হাতে, আর পশ্চিম দারফুর পুরোপুরি আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে।
জাতিসংঘের মতে, সংঘাত এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তী কোরদোফান অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নতুন করে বড় মাত্রার হত্যাযজ্ঞ চলছে।
দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সুদানের এই যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত হয়েছেন, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষুধা সংকটে পরিণত হয়েছে।







