
নতুন সূর্যোদয়ের মতো বড় প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও বর্তমান অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে ‘জনতুষ্টিবাদী’ বা সস্তা জনপ্রিয়তার কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ এখন সরকারের হাতে নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, নতুন সরকারের এখনকার প্রধান মন্ত্র হওয়া উচিত— ‘আর্থিক সংযম ও কৃচ্ছ্রসাধন’।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে দেশের অর্থনীতির এই নাজেহাল চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
বিগত সরকারের আমলের ‘ময়নাতদন্ত’ প্রয়োজন
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই সম্মাননীয় ফেলো মনে করেন, গত আওয়ামী লীগ সরকার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গভীর বিশ্লেষণ বা ‘ময়নাতদন্ত’ হওয়া জরুরি। বিশেষ করে বিদায়ী সরকার যেসব বৈদেশিক চুক্তি ও কেনাকাটা করে গেছে, সেগুলোতে কোনো অস্বচ্ছতা বা অনিয়ম আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি ‘উত্তরণকালীন দল’ গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “অনেক চুক্তি সম্পর্কে আমরা এখনো জানি না। সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।”
মার্চের মধ্যেই চাই শ্বেতপত্র বা আর্থিক বিবৃতি
আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আগামী মার্চের শেষ নাগাদ জাতীয় সংসদে একটি সুনির্দিষ্ট ‘আর্থিক বিবৃতি’ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। ড. দেবপ্রিয়র মতে, এই বিবৃতিই হবে সরকারের স্বচ্ছতার সবচেয়ে বড় পাহারাদার। তাড়াহুড়ো করে কোনো বড় সিদ্ধান্ত না নিয়ে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে বড় কোনো চমক দেখানোর চেয়ে আগামী বছরের জন্য একটি নিঁখুত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সিন্ডিকেট ভাঙার চ্যালেঞ্জ
বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের হাহাকার নতুন নয়। এ প্রসঙ্গে দেবপ্রিয় বলেন, রমজানে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের কারণেই দাম কমে না। নতুন সরকার সিন্ডিকেট ভাঙার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, দেশবাসী এখন তার বাস্তব প্রয়োগ দেখার অপেক্ষায় আছে।
প্রণোদনা কমানো ও মুদ্রার মান নিয়ে নতুন ভাবনা
অনুষ্ঠানে সিপিডির আরেক ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেমিট্যান্সে ২.৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিতে গিয়ে সরকারের কোষাগার থেকে বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা রাজস্বের ওপর বড় চাপ। এর পরিবর্তে ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করলে প্রবাসীরা এমনিতেই বেশি টাকা পাবেন এবং সরকারি অর্থের সাশ্রয় হবে।
সবশেষে, সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দেন— সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা, বিনিয়োগের খরা এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের পথ যে বেশ কণ্টকাকীর্ণ, তা আজ স্পষ্ট করে দিয়েছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম।







