বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

খালেদা জিয়ার জানাজায় জনসমুদ্র: এক নীরব গণভোট ও আগামীর রাজনৈতিক বার্তা

জোসেফ ডি কস্টা | সম্পাদক, কণ্ঠস্বর

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আকাশ আজ কেবল শোকের মেঘে ঢাকা ছিল না, বরং তা প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের যে বাঁধভাঙা ঢল নেমেছিল, তা কেবল ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, বরং একটি ‘নীরব গণভোট’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ৩টা ৩ মিনিট থেকে ৩টা ৫ মিনিট—এই মাত্র দুই মিনিটের জানাজা যেন কয়েক দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার বার্তা দিয়ে গেল।

অভূতপূর্ব জনসমুদ্র ও ইতিহাসের সংযোগ জানাজায় উপস্থিত মানুষের সংখ্যা কেউ বলেছে ২০ লাখ, কেউ বা ৩০ লাখ। তবে সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে এই উপস্থিতির তাৎপর্য। ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর থেকে আসা মানুষের এই মিলনমেলা মনে করিয়ে দিয়েছে ১৯৮৯ সালে ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনির জানাজা কিংবা মিসরের গামাল আবদেল নাসেরের বিদায়বেলার দৃশ্যকে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা, কারাবন্দী ও অসুস্থ একজন নেত্রীর জন্য মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র কাউকে দৃশ্যপট থেকে আড়াল করতে চাইলেও জনগণের হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারে না।

বিএনপির উজ্জীবন ও আওয়ামী লীগের জন্য চিন্তা এই জানাজা বিএনপির জন্য কেবল শোকের নয়, বরং নতুন করে আত্মবিশ্বাস পাওয়ার রসদ জুগিয়েছে। বছরের পর বছর নিপীড়ন ও বিভাজনের শিকার হওয়া একটি দল হঠাৎ আবিষ্কার করল তাদের সামাজিক শিকড় এখনো কতটা গভীরে। অন্যদিকে, দীর্ঘ এক যুগের বেশি ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের জন্য এটি এক গভীর চিন্তার বিষয়। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সামাজিক বৈধতা ও জনমানুষের আবেগ যে অন্য পথে বইছে, এই জনসমুদ্র তারই শক্তিশালী প্রমাণ।

কূটনৈতিক মেরুকরণ ও জয়শঙ্করের বার্তা খালেদা জিয়ার বিদায়বেলায় আন্তর্জাতিক রাজনীতির রাডারেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মাধ্যমে মোদি সরকারের শোকবার্তা তারেক রহমানের হাতে পৌঁছে দেওয়াকে কেবল ‘প্রটোকল’ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। ঐতিহাসিক দূরত্ব ঘুচিয়ে এটি কি বিএনপির প্রতি ভারতের নতুন কোনো নমনীয় ইঙ্গিত? কূটনীতির ভাষায় সৌজন্য কখনোই বার্তাহীন হয় না। জানাজায় উপস্থিত ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো বিএনপিকে এখন আর ‘অতীত’ নয়, বরং ‘সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

রাষ্ট্র বনাম সমাজ: ইতিহাসের রায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের এই দৃশ্য প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্র আর সমাজ এক নয়। পুলিশ বা প্রশাসনের শক্তি দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতা টিকে থাকে মানুষের স্মৃতি ও আবেগের গভীরে। যখন মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়, তখন তারা স্লোগান না দিয়েও ইতিহাসের ভাষায় কথা বলে। বেগম জিয়ার জানাজা ছিল তেমনই এক মুহূর্ত, যেখানে জনতা তাদের নীরব ভাষায় আগামীর রাজনীতির গতিপথ বাতলে দিয়েছে।


সহায়ক তথ্য ও বিশেষ দৃষ্টিকোণ:

  • আঞ্চলিক ভারসাম্য: পাকিস্তানের স্পিকার ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সরব উপস্থিতি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে এক নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

  • অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান: রাষ্ট্রীয় ভাষ্য বেগম জিয়াকে অদৃশ্য করে দিতে চাইলেও জানাজার এই বাস্তবতা প্রমাণ করল রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা সব সময় ক্ষমতার সাথে আসে না।

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন:

Back to top button