
শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে বিশাল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তবে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলের শেষ পর্যায়ে গণতন্ত্রের বিভিন্ন স্তম্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। এই বিষয়গুলোকে মূলত কয়েকটি পয়েন্টে ভাগ করা যায়:
১. নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা হ্রাস
গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি হলো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলো নিয়ে দেশে ও বিদেশে প্রবল বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
-
২০১৪: প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়।
-
২০১৮: ‘রাতের ভোট’ বা আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ।
-
২০২৪: ডামি প্রার্থী ও অনুগত দলগুলোর অংশগ্রহণে একতরফা নির্বাচন। এই নির্বাচনগুলো সাধারণ ভোটারদের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর চরম অনাস্থা তৈরি করে।
২. প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা খর্ব করা
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ—আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ। সমালোচকদের মতে, এই সময়ে শাসন বিভাগ (সরকার) বাকি অন্য দুটি বিভাগের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
৩. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের ওপর চাপ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন বড় ভূমিকা রেখেছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে। অনেক সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করার কারণে কারাবরণ করেছেন। ফলে দেশে একটি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ (Culture of Fear) তৈরি হয়।
৪. বিরোধী দল দমন ও বিচারবহির্ভূত তৎপরতা
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কণ্ঠরোধ করার জন্য গণগ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের হাহাকার আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
৫. দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজ
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট এবং বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জন্ম নেয়।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্রের মোড়কে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং জনদাবির প্রতি উপেক্ষা তাঁর এই পতনের অন্যতম কারণ। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ সংস্কারের মাধ্যমে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যাশা করছে সাধারণ মানুষ।







