বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠ থেকে গৃহবন্দিত্ব: পলাতক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নিপীড়নের চালচিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের নাম। একজন সেনা কর্মকর্তার সহধর্মিণী থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির নেতৃত্বে থাকা এই নেত্রী বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রভাব ফেলেছেন, তা অনস্বীকার্য। তবে গত দেড় দশকে তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন ছিল চরম নিপীড়ন ও বাধার এক দীর্ঘ মিছিল।

মাইনাস ফর্মুলা ও বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা করার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ছায়া লক্ষ্য করা যায়। এর প্রথম বড় আঘাত ছিল ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। সুদীর্ঘ ৪০ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মইনুল রোডের ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে তাঁকে এক প্রকার জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। রাজপথে ফেলে দেওয়া হয় তাঁর আসবাবপত্র ও স্মৃতিচিহ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল কেবল একটি উচ্ছেদ নয়, বরং তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার এক রাষ্ট্রীয় কৌশল।

নির্জন কারাবাস ও নাজিমুদ্দিন রোডের অন্ধকার

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে ৫ বছরের সাজা দিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেই বিশাল জনশূন্য কারাগারে তিনি ছিলেন একমাত্র বন্দী। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অভাবে সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই কারাবাসকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘মানবাধিকারের লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

চিকিৎসা নিয়ে টালবাহানা ও অবরুদ্ধ ‘ফিরোজা’

কারাগারে থাকাবস্থায় খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিস, হার্ট ও কিডনির মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর পরিবার ও চিকিৎসকরা বারবার উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নেওয়ার আবেদন জানালেও তৎকালীন সরকার তা ‘আইনি’ মারপ্যাঁচে আটকে রাখে। ২০২০ সালে কোভিডের সময় শর্তসাপেক্ষে তাঁর সাজা স্থগিত করা হলেও গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’-তে তিনি কার্যত গৃহবন্দী ছিলেন। বাড়ির সামনে পুলিশি পাহারা আর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

পরিবারের ওপর রাষ্ট্রীয় চাপ

নিপীড়ন কেবল খালেদা জিয়ার ওপরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবন ছিল তাঁর জন্য এক চরম যাতনা। এমনকি কোকোর মরদেহ যখন দেশে আনা হয়, তখনো তাঁকে অবরুদ্ধ অবস্থায় শোক পালন করতে হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দলটিকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিটি পদে পদে।

অদম্য এক রাজনৈতিক প্রতিরূপ

এতসব বাধা, জেল-জুলুম এবং প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার মুখেও খালেদা জিয়া তাঁর জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরতে দেননি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নই তাঁকে আরও দৃঢ়চেতা এবং গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর এই দীর্ঘ বন্দিত্বের অবসান ঘটে এবং তিনি পূর্ণ মুক্তি পান।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া আজও এক অজেয় শক্তির নাম, যিনি জেল-জুলুম সহ্য করেও নিজের নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর এই দীর্ঘ জীবন ও সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, প্রকৃত জননেতা কখনো রাজনৈতিক বাধার মুখে মুছে যান না, বরং সংকটে আরও প্রদীপ্ত হন।

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন:

Back to top button