
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যাকে সাধারণভাবে ছাত্রলীগ বলা হয়, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এটি মুক্তিযুদ্ধ ও ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময় সহিংসতা, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন এবং শিক্ষার্থী আন্দোলন দমন করে আসছে। ছাত্রলীগ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠন হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে নানাবিধ সহিংসতার সঙ্গে এটি যুক্ত।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলেও ছাত্রলীগের সহিংসতা বৃদ্ধি পায়।
-
১৯৭৩–১৯৭৫: বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে দখলদারিত্ব নিয়ে সংঘর্ষ। শিক্ষার্থী, প্রফেসর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা।
-
১৯৭৫–১৯৮১: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের সহিংসতা। হল দখল, ছাত্রলীগের ভেতরের দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ডের শুরু।

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সহিংসতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড।
-
বিশ্বজিৎ দাস (২০১১, ঢাকা): বিরোধীদল সমর্থক সন্দেহে ছাত্রলীগের সদস্যরা বিশ্বজিৎ দাসকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
-
আবরার ফাহাদ (২০১৯, বুয়েট): হলের বিরোধ ও রাজনৈতিক দখল নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দ্বারা পিটিয়ে হত্যা।
-
আবু বকর ছিদ্দিক (২০১০, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়): হল দখল নিয়ে সংঘর্ষের সময় আহত হয়ে মৃত্যু।
-
নাহিদ হোসেন (২০২২, ঢাকা কলেজ): স্থানীয় দোকানদারের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পিটিয়ে হত্যা।
-
জুবায়ের আহমেদ (২০১২, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়): ছাত্রলীগের অন্তর্কলহে আহত হয়ে নিহত।
-
তোফাজ্জল হোসেন (২০২৪, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়): মানসিকভাবে অসুস্থ শিক্ষার্থীকে মবজাস্টিসে পিটিয়ে হত্যা।
এছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে সহিংসতার অন্তত শতাধিক ঘটনা ঘটেছে।
ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা
ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বহুবার নারী ও ছাত্রীদের নির্যাতনের অভিযোগ এসেছে।
-
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯৯): ছাত্রলীগের শাখা নেতা ও অনুসারীরা অন্তত ২০ জন ছাত্রীকে নির্যাতন।
-
ইবিতে ফুলপরী খাতুন (২০২৩, কুষ্টিয়া): হলের গণরুমে পাঁচ-ছয়জন ছাত্রলীগের সদস্য নির্যাতন।
-
মুরারিচাঁদ ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণ (২০২০, সিলেট): ছয়জন ছাত্রলীগ সদস্যের দ্বারা গণধর্ষণ।
-
কক্সবাজারে নারী পর্যটক ধর্ষণ: তিনজন ছাত্রলীগ কর্মীর দ্বারা।
-
চট্টগ্রাম ও ইডেন কলেজে নারী নির্যাতন: ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানি।
শিক্ষার্থী আন্দোলন দমন
ছাত্রলীগ বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলন দমন করেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন
-
২০১৩: ঢাবি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লাঠি ও অস্ত্র দিয়ে হামলা।
-
২০১৮: ঢাবি ও কুষ্টিয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন।
-
২০২৪: লাঠি, রড, হকি স্টিক ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে দমন।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (২০১৮)
-
শিক্ষার্থীদের হত্যার প্রতিবাদে আন্দোলন দমন।
-
সাংবাদিকদের ওপর হামলা।
ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন (২০১৫)
-
ধানমন্ডি ও কাকলি মোড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি ও রড দিয়ে হামলা।
গেস্টরুম ও হল নির্যাতন
বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৩–২০১৯): ১৩টি আবাসিক হলে ৫৮টি নির্যাতনের ঘটনা।
-
বুয়েট (২০১৪–২০১৯): অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য।
সাংবাদিক ও সমালোচকদের ওপর হামলা
ছাত্রলীগ সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে তথ্য ও সংবাদ দমন করেছে।
-
২০২০ সিটি নির্বাচনের সময় কমপক্ষে ১০ জন সাংবাদিককে আক্রমণ।
-
সমালোচকদের ব্ল্যাকমেইল ও হুমকি।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
ছাত্রলীগ হিন্দু সম্প্রদায় ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় জড়িত।
-
রংপুর ও চাঁদপুরে ঘটনা।
-
স্থানীয় যুবক ও ইমামের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে উসকানি।

জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, নারীর উপর নির্যাতন, শিক্ষার্থী আন্দোলন দমন এবং সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণে এটি বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। দেশের শিক্ষাজগত, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিবেশে এ সংগঠনের প্রভাব গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।












