বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক রোডম্যাপ: সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ

জোসেফ ডি কষ্টা, সম্পাদক

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি। আইনি বিশেষজ্ঞ এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রধানত আইনি এবং কূটনৈতিক—এই দুই শক্তিশালী পথে অগ্রসর হতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সামনে থাকা সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলোর একটি বিস্তারিত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. আইনি প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি

শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার প্রথম ধাপ হলো তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ভিত্তি মজবুত করা।

  • আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার: জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

  • গ্রেফতারি পরোয়ানা ও রেড নোটিশ: আদালতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে তা ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ আকারে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর অবস্থানের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে এবং ভারত সরকারের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বৃদ্ধি পাবে।

২. বহির্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) এর প্রয়োগ

২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘বহির্পণ চুক্তি’ এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে।

  • চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা: এই চুক্তির আওতায় উভয় দেশ দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন আসামিকে একে অপরের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যদি কোনো অপরাধের সাজা উভয় দেশের আইনে অন্তত এক বছরের কারাদণ্ড হয়, তবে সেই ব্যক্তিকে হস্তান্তরযোগ্য অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায়।

  • আনুষ্ঠানিক আবেদন: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারকে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য শক্তিশালী আইনি যুক্তি ও প্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাতে হবে।

৩. ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার শেখ হাসিনার কূটনৈতিক পাসপোর্ট (Red Passport) বাতিল করেছে।

  • বৈধতার সংকট: পাসপোর্ট বাতিলের ফলে তিনি বর্তমানে কোনো বৈধ ভ্রমণ দলিল ছাড়াই ভারতে অবস্থান করছেন। কোনো দেশের নাগরিকের পাসপোর্ট বাতিল হলে সেই দেশে তাঁর অবস্থানের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই বিষয়টিকে ভিত্তি করে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আইনি দাবি আরও জোরালো করা সম্ভব।

৪. দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা

শুধুমাত্র আইনি লড়াই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচারণা।

  • ভারত সরকারের ওপর চাপ: ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে তাঁকে ফেরত দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে তিনি যদি দিল্লিতে বসে উস্কানিমূলক বক্তব্য বা সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ান, তবে তা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে ভারতের কাছে তুলে ধরতে হবে।

  • আন্তর্জাতিক জনমত গঠন: জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে তাঁর শাসনামলে সংঘটিত অপরাধ ও জুলাই গণহত্যার তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতে হবে। এর ফলে ভারত তাঁকে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়বে।

৫. চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকার

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারত যদি মনে করে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিলে তাঁর জীবনের ঝুঁকি রয়েছে বা তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হবেন, তবে তারা হস্তান্তরের আবেদন দীর্ঘায়িত বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশ্বদরবারে প্রমাণ করতে হবে।

শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হতে পারে। তবে আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ এবং কূটনৈতিক কৌশলের সঠিক সমন্বয় ঘটলে তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন:

Back to top button