চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় যুদ্ধে পাঠানো হয় ৩০ জনকেঃ এসআরবি

আরিফুর সাদনানঃ রাশিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে পাচার করে মানবপাচার চক্রের সদস্যরা। পরে তাদেরকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়। যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জন বাংলাদেশি মারা যায়। এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মিজানসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে বলে জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
এসআরবি বলছে, ভুক্তভোগীরা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হতো। মূলত প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে যুদ্ধের ময়দানে শিকার হিসেবে পাঠানো হতো তাদের। এরপর তাদের ওপর প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা করলে হামলাকারীদের আবস্থান ও দূরত্ব শনাক্তের জন্যই তাদের শিকার হিসেবে পাঠানো হতো।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজার এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান।
গ্রেফতারকৃতরা হলো, মিজানুর রহমান (৫৫) ও মো. আবু তাহের লেন্টু (৫০)
মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) গভীর রাতে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানাধীন আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসামি মিজানুর রহমান (৫৫) ও ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. আবু তাহের লেন্টুকে (৫০) গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজসে ভুক্তভোগী রাজন হোসেনকে (২১) কনস্ট্রাকশন সাইটের কাজের কথা বলে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রাশিয়ায় পাঠায়। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাকেসহ বাংলাদেশি ৩০ জনকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। চার দিন কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নেন রাজন। একপর্যায়ে আহত অবস্থায় তিনি পালিয়ে দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন।
তিনি বলেন, পরবর্তীতে ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ দাবি করলে আসামি মিজানুর রহমান ভুক্তভোগীর পরিবারের লোকজনকে গালিগালাজ, মারধরের চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করেন।
অনুসন্ধানের তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, এই চক্রের হোতারা প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়াতে পাচার করে। পরে তাদেরকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেছে এবং ২ জন কোন রকমে পালিয়ে দেশে ফেরত আসে। এছাড়াও বাকি ৮ জনের মধ্যে ২ জন আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি ৬ জন এখনও যুদ্ধের ময়দানে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণের জন্য তাদেরকে পাঠানো হয় এক ধরনের শিকার হিসেবে। যখন প্রতিপক্ষ তাদের ওপরে আক্রমণ করে, ড্রোন হামলা করে, তখন তারা যেন বুঝতে পারে কতদূর-কোন জায়গা থেকে তাদের ওপর আক্রমণটা হলো। ড্রোন দিয়ে অ্যাটাক করা হলো। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তকরণ বা লোকেট করার জন্যই মূলত তাদেরকে শিকার হিসেবে সেখানে পাঠানো হয়।
এসআরবি জানায়, পাচার চক্রের মূলহোতা মিজান জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির চেয়ারম্যান। মিজানের জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ২১ জন ভুক্তভোগীকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। এছাড়াও বাকিদের ওই দেশে পাঠানোর পেছনে মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামের আরও দুজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। এছাড়াও পাচার চক্রে হারেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ৩০ জনকেই পাসপোর্ট থেকে শুরু করে, প্লেনে উঠিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সবকাজ করেছিলেন মূলহোতা মিজান। ভুক্তভোগীরা রাশিয়া গিয়ে যখন তাদের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে পারে তখন ওই ৩০ জন মিজানকে অনুরোধ করেছিলেন যে আমাদেরকে ভুল জায়গায় আপনারা পাঠিয়েছেন। আমাদেরকে রক্ষা করেন, ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা ভুক্তভোগীদের কোনো কথা শোনেননি। এই বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় মানব পাচার চক্রের সঙ্গে দুই ব্যক্তির জড়িত থাকার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।







