বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

১৯৭৩ এর নির্বাচন- শেখ মুজিবের হাত ধরেই গণতন্ত্রের অঙ্কুরে রোপিত হয়েছিল বর্তমান সংকটের বীজ?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন এদেশের মানুষ দেখেছিল, তার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা ছিল এই নির্বাচন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টে আজ যখন সেই নির্বাচনের মূল্যায়ন করা হয়, তখন উঠে আসে এক অন্য চিত্র। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনিয়ম ও পেশিশক্তির যে সংস্কৃতি আজ প্রতিষ্ঠিত, তার সূচনা হয়েছিল মূলত ১৯৭৩ সালেই।

বিরোধীদের দমনে ‘জেনেটিক’ আক্রমণ

সেদিনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কোনো আশঙ্কা ছিল না। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও স্বাধীনতার নেতৃত্বের জোয়ারে তাদের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বিজয়ী হওয়ার চেয়ে ‘বিরোধীহীন’ সংসদ গঠনের আকাঙ্ক্ষাই কাল হয়েছিল দেশটির জন্য। ঐতিহাসিক অলি আহাদ ও হালিম দাদ খানের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে কীভাবে ক্ষমতার দাপটে বিরোধীদের কোণঠাসা করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতোই ১৯৭৩ সালেও ৩০০ আসনের মধ্যে বিরোধীরা পেয়েছিল মাত্র ৭টি আসন।

মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা ও অপহরণ

নির্বাচনের আগেই ১১ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। তথ্যসূত্র বলছে, এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। ভোলার তোফায়েল আহমেদ, মাগুরার সোহরাব হোসেন এবং ফরিদপুরের কেএম ওবায়দুর রহমানের মতো হেভিওয়েট নেতারা বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ছিল ভোলার ডাঃ আজহারউদ্দিনের ঘটনা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী এই নেতাকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই অপহরণ করা হয়, ফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন।

জাতীয় নেতাদের বিতর্কিত ভূমিকা

তৎকালীন প্রবাসী সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও এইচএম কামরুজ্জামানের মতো জাতীয় চার নেতার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল যে, তারা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করেছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, যারা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাণ দিতে প্রস্তুত থাকা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, ১৬ ডিসেম্বরের পর তাদের অনেকের মধ্যেই লুটপাটকারী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীর চরিত্র ফুটে ওঠে।

‘মিডিয়া ক্যু’ ও ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ

নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল ফলাফল জালিয়াতির। ন্যাপ প্রার্থী মোশতাক আহমদ চৌধুরী ও অলি আহাদ নিজেদের নিশ্চিত জয়ের পথে দেখলেও বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের পরাজিত ঘোষণা করা হয়। একে তৎকালীন সময়ে ‘মিডিয়া ক্যু’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের জয়ের ব্যবধান বাড়াতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ভোট যোগ করার অভিযোগ পাওয়া যায়, যেন তাঁর ‘সম্মানহানি’ না হয়।

বিশিষ্টজনদের আক্ষেপ

সাবেক মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ তাঁর ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থে বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন, কেন খাঁন আতাউর রহমানের মতো ধীরস্থির ও গঠনমূলক চিন্তার মানুষকে পার্লামেন্টে ঢুকতে দিতে আওয়ামী লীগ এতটা মরিয়া ছিল, তা বোধগম্য নয়। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের এই ‘আত্মবিশ্বাসের অভাবই’ মূলত ম্যানেজড নির্বাচনের জন্ম দিয়েছিল।

বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ

নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব এবং মেজর জলিল অভিযোগ করেন যে, তাদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছিল এবং জাল ভোটের মহোৎসব চলেছে। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টি এবং ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদও যৌথ বিবৃতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নগ্ন ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। ন্যাপের দাবি অনুযায়ী, অন্তত ৭০টি আসনে নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও গায়ের জোরে তাদের পরাজিত করা হয়।

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে যে অনিয়ম ও জালিয়াতির মহড়া হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং আধুনিককালের ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে দেখা গেছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হতে না পারার সেই ব্যর্থতাই কি আজকের এই গভীর রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ? উত্তরটি হয়তো ইতিহাসের পাতায় এখনও অমীমাংসিত।

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন:

Back to top button