বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আপসহীন চার দশক: মচকাননি কখনো, দেশপ্রেমই যাঁর পরিচয়

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে গত চার দশকে অনেক নেতার উত্থান-পতন হয়েছে, দলবদল হয়েছে, আদর্শের বিচ্যুতি ঘটেছে। কিন্তু একজন মানুষ নিজের অবস্থানে পাহাড়ের মতো অটল থেকেছেন। তিনি খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কঠিন ময়দানে পা রাখা এই নেত্রী সময়ের পরিক্রমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ‘আপসহীন’ এক প্রতীক হিসেবে।

আপসের বদলে সংগ্রাম: গৃহবধূ থেকে রাজপথের লড়াকু জননেত্রী। স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রের উত্তরণ—প্রতিটি ধাপে অনড় সিদ্ধান্তের এক জীবন্ত প্রতীক।
আপসের বদলে সংগ্রাম: গৃহবধূ থেকে রাজপথের লড়াকু জননেত্রী। স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রের উত্তরণ—প্রতিটি ধাপে অনড় সিদ্ধান্তের এক জীবন্ত প্রতীক।

সংগ্রামের শুরু ও এরশাদবিরোধী আন্দোলন ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতের পর অনেকটা বাধ্য হয়েই বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন হওয়ার পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও একরোখা জেদ ফুটে ওঠে। ১৯৮৬ সালে যখন এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিধা ছিল, তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নিলেও খালেদা জিয়া তা বয়কট করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বৈরশাসকের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারে না। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বিজয় সেই সিদ্ধান্তের নৈতিক বিজয় হিসেবেই দেখা হয়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের অস্তিত্ব যখন সংকটে, ঠিক তখনই তিনি প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের অস্তিত্ব যখন সংকটে, ঠিক তখনই তিনি প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।

এক-এগারো ও বিদেশে না যাওয়ার জেদ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা ছিল ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। যখন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা দিয়ে দুই প্রধান নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল, তখন শেখ হাসিনা বিদেশে গেলেও খালেদা জিয়া দেশ ছাড়তে রাজি হননি। শত চাপ ও কারাবরণ সত্ত্বেও তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, বিদেশের মাটিতে নয়, দেশের মাটিতেই তাঁর ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তাঁর এই অনমনীয় অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিল তিন জোটের ঢাকা অবরোধ। তার পরদিন রাজধানীর হোটেল পূর্বাণী থেকে খালেদা জিয়াকে আটক করে পুলিশ
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ছিল তিন জোটের ঢাকা অবরোধ। তার পরদিন রাজধানীর হোটেল পূর্বাণী থেকে খালেদা জিয়াকে আটক করে পুলিশ

আওয়ামী লীগ আমল ও কারাজীবন ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল তাঁর জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। ২০১৭ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকাকালে অনেকেই রটিয়েছিলেন যে তিনি আর দেশে ফিরবেন না। কিন্তু সব জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি দেশে ফেরেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। ২০২০ সালে কোভিডের সময় বিশেষ বিবেচনায় জেল থেকে বাসায় ফেরার অনুমতি পেলেও তা ছিল শর্তসাপেক্ষ এক ধরনের ‘গৃহবন্দিত্ব’। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর চূড়ান্তভাবে মুক্ত হন এই নেত্রী।

২০০১ সালে সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া
২০০১ সালে সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া

ব্যক্তিগত ত্যাগ ও রাজনৈতিক অর্জন সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়াকে অনেক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মূল্য দিতে হয়েছে। হারিয়েছেন প্রিয়জনদের, শিকার হয়েছেন রাজনৈতিক নিপীড়নের। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্তে তিনি অটল ছিলেন, যার জন্য তাঁকে ও তাঁর দলকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। তবে অনুসারীদের কাছে তিনি আজও সেই নেত্রী, যিনি পরাজয় মেনে নিতে পারেন কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে হাত মেলাতে জানেন না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া কেবল একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং এক অনমনীয় নেতৃত্বের উদাহরণ। তাঁর জীবন ও রাজনীতি বারবার একটি বার্তাই দেয়—সাময়িক লাভ বা ক্ষমতার চেয়ে নিজের নীতিতে অটল থাকাটাই দীর্ঘমেয়াদে নেতার আসল শক্তি।

বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন:

Back to top button