কোমা থেকে ক্যানসার, যেভাবে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন আবুল হায়াত

বাংলাদেশের অভিনয় জগতের এক অনন্য নাম আবুল হায়াত। জীবনের পথে বারবার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নতুন করে। কোমা থেকে শুরু করে ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগ—সবকিছু জয় করেছেন মনের জোরে, পরিবারের ভালোবাসায় আর অবিচল সাহসে। আজ ৮১ বছরে পা রাখা এই বরেণ্য অভিনেতার জন্মদিনে উঠে আসছে তাঁর জীবনের অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। দেশে চলছে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যা। ঠিক সেই সময় হাসপাতালে কোমায় ছিলেন আবুল হায়াত। টানা ছয় দিন—২৩ থেকে ২৮ মার্চ তিনি ছিলেন অচেতন অবস্থায়। ২৯ মার্চ চোখ খুলে জানতে পারেন, তিনি বাবা হয়েছেন। ফুফুশাশুড়ির কোলে দেওয়া মাত্র ছয় দিনের কন্যাশিশু বিপাশাকে দেখে তিনি যেন নতুন করে বেঁচে ওঠেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে এই আনন্দ তাঁর জীবনের এক বড় প্রেরণা হয়ে ওঠে।
পঞ্চাশ বছর পর আবার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে। ২০২১ সালে চিকিৎসকরা জানান, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। সংবাদটি শোনার পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্তব্ধ হয়ে যান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। আবেগ চেপে রাখতে না পেরে নিজের আত্মজীবনী ‘রবি পথ’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন,
“চিকিৎসক বললেন, আমার ক্যানসার হয়েছে। আমি ক্যানসারের রোগী। বাসায় ফিরে আর কথা বলতে পারিনি।”
এই কঠিন সময়ে জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ান স্ত্রী শিরিন হায়াত। আবুল হায়াত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“আমার স্ত্রী আমাকে সব সময় বলেছে, এটা কোনো ব্যাপার না। আমরা আছি, চিকিৎসা হবে, তুমি সুস্থ হবে। আমার মেয়েরা খবর পেয়ে বলেছে, আব্বু চিন্তা করো না।”
তবু একা অন্ধকার ঘরে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। তখন পাশে এসে স্ত্রীর হাত ছুঁয়ে তিনি যেন আবার দাঁড়ানোর সাহস পান। আবুল হায়াত স্বীকার করেন,
“আজ আমি তিন বছর ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। শুধু ওর জন্যই। সে আমাকে শিখিয়েছে—আই অ্যাম আ ফাইটার।”
সংসার জীবনে শিরিন হায়াতই ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় সহযোদ্ধা। সরকারি চাকরি আর অভিনয়ের ব্যস্ততায় সংসারে খুব একটা সময় দিতে না পারলেও শিরিন একা হাতে দুই মেয়ে—বিপাশা ও নাতাশাকে বড় করেছেন। আবুল হায়াত বলেছিলেন,
“আমার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তই ওর সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছি। সরকারি চাকরি ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও ওর পরামর্শে নিয়েছি।”
আজও মাসের অন্তত ১৫ দিন শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকেন তিনি। ঢাকার ভেতরে ও বাইরে ছুটে বেড়ান অভিনয়ের টানে। আশিতে দাঁড়িয়ে জীবনকে কেমন মনে হয়? উত্তর একটাই—
“জীবন সুন্দর।”
আবুল হায়াতের বেঁচে থাকার মন্ত্র—
“জীবন মানেই কাজ। যে কাজটাকে ভালোবাসি, সেটাই আমি করে যাচ্ছি। তাই হয়তো এতদিন বেঁচে আছি। সবাই জানতে চায় আমি সুখী কি না। আমি বলব, আমি পুরোপুরি সুখী।”
আবুল হায়াতের জীবন যেন জীবন্ত এক অনুপ্রেরণা। কোমা, ক্যানসার—বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে তিনি শিখিয়েছেন, জীবনের শক্তি আসে পরিবার থেকে, ভালোবাসা থেকে এবং নিজের কাজকে ভালোবাসা থেকে।







