মরুর দুম্বা থেকে গাড়ল—নাটোরের খামারে পশুর বৈচিত্র্য

দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে দলছুট কোনো ভেড়ার পাল। কিন্তু একটু কাছে গেলেই ভুল ভাঙবে।
ঘন পশম আর ভারী লেজের এ প্রাণীগুলো আসলে দূর মরুভূমির দুম্বা। শুষ্ক আর তপ্ত বালুকাভূমির এ বাসিন্দা এখন দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার পাথুরিয়া গ্রামের একটি খামারে।
আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে এসেছে দুম্বাগুলো।
তবে তার আজকের এ সাফল্যের পেছনের গল্পটা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন আনোয়ার। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় টিকে থাকতে তখন সম্বল বলতে ছিল কেবল দুই থেকে তিনটি ছাগল। সেই অতি ক্ষুদ্র শুরু আজ দুই ভাই আনোয়ার হোসেন ও আব্দুল হান্নানের অক্লান্ত পরিশ্রমে এক বিশাল সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে। ৩২ বিঘা জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এ সমন্বিত খামারটি এখন এলাকার অন্যতম বড় এক কৃষি বিপ্লবের প্রতীক।
খামারের শুরু এবং দুম্বার আগমনের ইতিহাস সর্ম্পকে খামারি আনোয়ার বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর ঘরে সামান্য কয়েকটি ছাগল লালন-পালন দিয়ে শুরু করেছিলাম। ধীরে ধীরে পশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০১০ সালে বড় পরিসরে গাড়ল পালনের মাধ্যমে আমার খামারের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর পরিচিত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভারত থেকে তিনটি মাদি এবং একটি পুরুষ দুম্বা নিয়ে আসি। সেই চারটি দুম্বা দিয়ে শুরু করা খামারে আজ দুম্বার সংখ্যা ৬০।
আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে আনোয়ারের খামারে এখন উৎসবের আমেজ। খামারের মোট ৬০টি দুম্বার মধ্যে ৩০টি দুম্বা এবার কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে।
‘ভিনদেশি’ এ পশুর দাম কেমন হতে পারে জানতে চাইলে আনোয়ার জানান, জাত, দৈহিক আকার এবং শারীরিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে একেকটি দুম্বার দাম হাঁকা হচ্ছে এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত।
তিনি আরও জানান, শুরুতে বাংলাদেশে দুম্বার চাহিদা বা এর মাংস নিয়ে মানুষের মনে দ্বিধা থাকলেও, সময়ের ব্যবধানে এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে কোরবানি উপলক্ষে এর চাহিদা তৈরি হয় বহুগুণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সৌখিন ক্রেতারা যেমন সরাসরি খামারে এসে দুম্বা কিনছেন, তেমনি সাধারণ দর্শনার্থীরাও জীবনে প্রথমবার মরুর এ প্রাণীকে কাছ থেকে একনজর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমাচ্ছেন।
আনোয়ার ও আব্দুল হান্নান দুই ভাইয়ের এ সাফল্য শুধু তাদের নিজেদের ভাগ্যই বদলায়নি, সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেকেই এখন ছোট পরিসরে দুম্বা পালনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তারা নিজেরাও নতুন খামারিদের উৎপাদিত দুম্বা বিক্রির ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতা করেন। গত কোরবানি ঈদে নিজের এবং আশেপাশের খামারিদের মিলিয়ে মোট ৮০টি দুম্বা বিক্রি করেছিলেন তারা। তবে এবার ক্রেতাদের সাড়া এতটাই বেশি যে এ ঈদে দুম্বা বিক্রির সংখ্যা দুই শতাধিক পার হয়ে যাবে বলে তারা শতভাগ আশাবাদী।
দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ আর স্নিগ্ধ বাতাস। চারপাশের এমন চিরচেনা গ্রামীণ আবহেই অলস ভঙ্গিতে দলবেঁধে হেঁটে বেড়াচ্ছে কিছু প্রাণী।
মরুভূমির এ প্রাণীগুলো বাংলার মাটিতে কীভাবে সুস্থ থাকছে, তার রহস্য লুকিয়ে আছে এদের খাদ্যাভ্যাসে। খামারে দুম্বা, ছাগল, গরু কিংবা গাড়ল-সব প্রাণীর জন্যই নিশ্চিত করা হয় সম্পূর্ণ নিরাপদ ও প্রাকৃতিক দেশীয় খাদ্য। প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী এদের দুই বেলা খড় ও ভুসির মিশ্রণ দেওয়া হয়, আর দুপুরে দেওয়া হয় তাজা সবুজ ঘাস। পশুর এ বিশাল খাদ্যচাহিদা মেটাতে তারা নিজেদের জমিতে উন্নত জাতের ঘাসের চাষ শুরু করেছেন।
ব্যক্তিগত লাভের পাশাপাশি এ খামারটিতে স্থানীয় ২৩ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। দিনরাত এক করে তারা খামারের পশুদের যত্নে নিয়োজিত থাকেন।
ঈদ ঘনিয়ে আসায় এখন পশুগুলোকে পরিপাটি, রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখতে বাড়তি খাটাখাটুনি করতে হচ্ছে তাদের।
খামারের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ১০ বছর ধরে আমি এ খামারে কাজ করছি। এখানে আসার আগে দুম্বা জিনিসটা কেবল নামেই শুনেছিলাম, চোখে দেখিনি। এখন নিজের হাতে প্রতিদিন মরুর এ প্রাণীর যত্ন নিতে পারি, এটা ভেবেই খুব ভালো লাগে। ঈদের কারণে আমাদের ব্যস্ততা এখন বেশি। প্রতিদিন মানুষ দেখতে আসছে, ক্রেতারা আসছে, তাই পশুগুলোকে সুন্দর ও সুস্থ রাখতে আমাদের বাড়তি খেয়াল রাখতে হচ্ছে। আনোয়ার ও আব্দুল হান্নানের এ স্বপ্নের খামারে দুম্বা ছাড়াও রয়েছে ১৪টি ভিন্ন প্রজাতির ছাগল, দেশি-বিদেশি জাতের গরু এবং বিপুল সংখ্যক গাড়ল। ফলে সব ধরনের ক্রেতার জন্যই এটি একটি আদর্শ হাটে পরিণত হয়েছে।দুম্বা+ছাগল
নাটোর সদর উপজেলার করোটা এলাকা থেকে দুম্বা দেখতে আসা আলতাফ হোসেন ও দিঘাপতিয়া এলাকার আব্দুল গফুর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, মরুভূমির দুম্বার কথা এতদিন শুধু বই-পুস্তকে পড়েছি বা ভিডিওতে দেখেছি। সামনাসামনি দেখার সুযোগ আগে কখনও হয়নি। আমাদের নাটোরের মাটিতেই এ প্রাণী সফলভাবে পালন করা সম্ভব হচ্ছে, এটা দারুণ এক আনন্দের খবর। দেখে তো মনে হচ্ছে এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যদি একটু উদ্যোগী হয়, তবে বাংলাদেশে দুম্বা পালন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বাংলানিউজকে বলেন, সাধারণত দুম্বা শুষ্ক ও গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলের প্রাণী হলেও আমাদের দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে এরা চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে। উপরন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে তাপমাত্রা বাড়ায় বাংলাদেশে দুম্বা পালনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। গুরুদাসপুরের এ বড় খামারটি তার অন্যতম উদাহরণ, যেখানে এবার ঈদের জন্য ৩০টি দুম্বা প্রস্তুত আছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে খামারিদের যেকোনো প্রয়োজনে সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে পুরো জেলায় ২১ হাজার ৩৭৪টি খামারে মোট চার লাখ ৭৫ হাজার ৪৪৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। অথচ পুরো নাটোর জেলায় পশুর স্থানীয় চাহিদা রয়েছে মাত্র দুই লাখ ৭৪ হাজার ৬১১টি। হিসাব অনুযায়ী, জেলার নিজস্ব চাহিদার তুলনায় কোরবানির পশুর জোগান রয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এ বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পশু ও দুম্বা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় বড় পশুর হাটে বিক্রির জন্য পাঠানো হবে, যা দেশের সার্বিক কোরবানির পশুর বাজার নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে।







